The news is by your side.

আষাঢ়ের ঢল আর শ্রাবনের ধারা বর্ষার পানিতে খাল-বিল থৈ থৈ

0

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

কবি গুরু রবীন্দ্র নাথ ঠাকুর এর আষাঢ় কবিতাটি শিশুকালে আমরা পাঠ্য বইতে পড়েছি, তৎসময়ই আমাদের শিশু মনে, আষাঢ়ের ঢল আর শ্রাবনের ধারা মন জুড়ে বহে চলতো, বিচরন করতাম মেঘের দেশে। জুড়িয়ে যেত মন প্রান, জানালার শিক ধরে একাধারে বহে চলা বৃষ্টির সাথে মিতালী করতাম, নানা ধরনের কল্পনার ফানুস আকতাম, সেই নিরিবিলি রিমঝিম টাপুর টুপুর শব্দের সাথে নিজেকে ঘরে আবদ্ধ রাখতে মনে মনে গেয়ে চলতাম— কবি গুরুর সেই বিখ্যাত শিশুতোষ কবিতাটি—————————–

‘নীল নব ঘনে আষাঢ় গগনে

তিল ঠাঁই আর নাহিরে।

ও গো, আজ তোরা যাস নে ঘরের বাহিরে।

বাদলের ধারা ঝরে ঝর ঝর,

কালি-মাখা মেঘ ওপারে আঁধার

ঘনিয়েছে দেখ চাহিরে।

ও গো, আজ তোরা যাসনে ঘরের বাহিরে…’।

আমাদের প্রাকৃতির মাঝে বিচরন করে ছয়টি ঋতু – শীত-বসন্ত- গ্রীস্ম- বর্ষা-শরৎ আর হেমন্ত, পৌষ-মাঘ শীত কাল, ফাল্গুন-চৈত্র বসন্তকাল, বৈশাখ- জোষ্ঠ গ্রীস্মকাল, আষাঢ়-শ্রাবন বর্ষাকাল, ভাদ্র-আশ্বিন শরৎকাল, কার্ত্তিক-অগ্রহায়ন হেমন্তকাল, ছয়টি ঋতু নানা রংয়ে-বর্নে আমাদের মাঝে ধরা দেয়, প্রাকৃতির এই বৈচিত্র ও খেয়ালীপনার কিছু প্রভাব আমাদের জীবনধারায়ও লক্ষ্যনীয় পরিবর্তন আনে। যেমন শীতের পিঠা আর কাঁথা, বসন্তে কোকিলের কুহ কুহ- বাহারী ফুলের রংয়ে প্রাকৃতি সাঝে, গ্রীস্মে প্রচন্ড গরম-কাঠ ফাটা রৌদ্র, বর্ষায় অজ¯্র ধারায় বহে চলে বৃষ্টিরধারা, এই চারটি ঋতু আমাদের জীবনধারার সাথে মিশে আছে, তবে শরতের বাহারী কাঁস ফুলের শুভ্র রুপ আর হেমন্তে মাঠভরা কৃষকের পাকাধান ও নবান্ন উৎসব আমাদের জীবনধারায় বহে যায়।  গ্রীস্মে শেষ পয্যায় ২/১ দিনের মধ্যেই চলে আসবে আষাঢ় মাস পা দিবে বর্ষা কালে, আষাঢ়-শ্রাবণ এই দুই মাস বর্ষাকাল অর্থাত্ বর্ষা ঋতু। আষাঢ়ের কদম ফুল আর শ্রাবনেরধারা এতেই চেনা যায় বর্ষা, এ ঋতুর প্রধান বৈশিষ্ট বৃষ্টি ঝড়া আকাশ, কর্দমাক্ত মাঠ, নদ-নদী, খাল-বিল, পুকুর-ডোবা পানিতে পরিপূর্ণ হওয়া, গাছপালার সতেজ রূপ,গরম আবহাওয়া ইত্যাদি ইতাদি।

জ্যৈষ্ঠের প্রচন্ড গরম আম জাম কাঁঠাল পাকার মরশুম। জ্যৈষ্ঠের দমফাটা গরম যেমন অস্বস্তিকর তার বিপরীতে আছে বাহারী ফলের সমাহারে মনভুলানো প্রকৃতি। এ সময়টায় বাজারে প্রায় সব ধরনের ফল পাওয়া যায়। কবির ভাষায় “পাকা জামের মধুর রসে রঙিন করি মুখ”। জ্যৈষ্ঠের মধুমাস পেরিয়ে গাছে গাছে কদম ফুল ফোটে। জানিযে দেয় আষাঢ় আসছে।  ১ শ্রাবণ, শুরু হয় বর্ষাঋতু।

 রুদ্র গ্রীষ্মের দাবদাহন শেষে প্রকৃতির রাণী চিরসুন্দর শ্যামলী বর্ষার আগমনে ঘটে। কিন্তু কোনো কোনো বছর বৃষ্টির কোন দেখা যায় না, গরম পড়ছে অবিরাম। সবাই যেন মন প্রাণ উজাড় করে সৃষ্টিকর্তার কাছে বৃষ্টির জন্য প্রার্থনা করছে, আয় মেঘ ঝাপিয়া, ধান দেব মাপিয়া, আবার কোনো কেনো এলাকায় বৃষ্টির আগমনের জন্য ব্যঙের বিয়ের আয়োজন করছে। সাধারণ মানুষের বিশ্বাস ব্যঙের বিয়ে দিলে বৃষ্টির আগমন ঘটবে। ডাহুক আপন মনে ডাকতে ডাকতে বর্ষার আগমনবার্তা জানিয়ে দেয়।

আবার যখন কয়েক দিন ব্যাপি বৃষ্টি অজ¯্রধারায় বহে চলে, শিশুরা গৃহে আবদ্ধ হয়ে পড়ে, ব্যবসা-বানিজ্য স্থবির হয়ে পড়ে-কৃষখ-শ্রমিক বেকার থাকে, তখন কিন্তু সকলে বৃষ্টি তাড়িয়ে রৌদ্র উজ্জল আকাশ এর দেখা পেতে চায়।

মেঘের কোলে রোদ হেসেছে/বাদল গেছে টুটি/আজ আমাদের ছুটি ও ভাই/আজ আমাদের ছুটি। ছুটি ছড়ায় মেঘ সরিয়ে, বাদল হটিয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বেঁধেছেন বর্ষার গান। বাদল দিনের প্রথম কদম ফুল, আজ শ্রাবণের আমন্ত্রণে দুয়ার কাঁপে, আজি ঝর ঝর মুখর বাদল দিনেসহ অনেক গানে স্নাত হয়েছে, কবি গুরু রবিন্দ্র নাথ ঠাকুরের অমর বর্ষা কবিতায়।

বাঙলা অনেক প্রখ্যাত কবিগন বর্ষকে নিয়ে বহু কবিতা রচনা করে গেছেন,অনেক কবিতা আমাদেও জীবনের সাথে মিশে আছে, এমনই একজন বাংলা,বাঙালীর কবি,কবি ফকরুল আহামেদএর বৃষ্টি নামে রিমঝিমিয়ে কবিতায় বর্ষার অপরুপ লাবন্য প্রকাশ পেয়েছে–

রিমঝিমিয়ে রিমঝিমিয়ে,

টিনের চালে, গাছের ডালে

বৃষ্টি ঝরে হাওয়ার তালে,

হাওয়ার তালে গাছের ডালে

বৃষ্টি ঝরে তালে তালে

বৃষ্টি পড়ে টাপুর টুপুর,

বৃষ্টি নামে মিষ্টি মধুর,

জুই চামেলি ফুলের বোঁটায়

বৃষ্টি নামে ফোঁটায় ফোঁটায়,

বাদলা দিনের একটানা সুর

বৃষ্টি নামে ঝুমুর ঝুমুর।

বর্ষাকালে বৃষ্টিপাত প্রাকৃতিক নিয়মেই হয়। বাতাসে মৌসুমী বায়ুর উপস্থিতি বেশি থাকার কারণে বৃষ্টিপাত বেশি হয়ে থাকে। সমুদ্র এলাকায় মৌসুমী বায়ু সক্রিয় থাকে। বর্ষাকালে এই মৌসুম বায়ু আস্তে আস্তে সারা দেশে প্রভাাব বিস্তার করে। মৌসুমী বায়ুর আগমনে জ্যৈষ্ঠের গুমোট গরমের ভাবটা কেটে গিয়ে প্রশান্তির একটা হাওয়া বয়ে যায়। আষাঢ়ে-শ্রাবণে অঝোর বর্ষণ গোটা পরিবেশটাকেই আরো প্রাণবন্তর করে তোলে।

বর্ষার কোমলতায় গ্রীষ্মের ঋতুর নিমর্মতা অর্থাত্ ঘাম ঝড়ে দর দর গ্রীষ্মের দুপুরে; মাঠ ঘাট চৌচিড় জল নেই পুকুরে এ ধরনের বাস্তবতার অবসান ঘটে। বর্ষায় আকাশে ভেসে বেড়ায় সাদা কলো মেঘ। কখনো বৃষ্টি, কখনো রোদ্র। কখনো সারাদিন অঝোরে বর্ষণ ঝড়ছে তো ঝড়ছেই। বর্ষার আকাশ ফর্সা হয় না। এই মেঘ, এই বৃষ্টি। মাঝে মাঝে সাদা কালো মেঘের ফাঁক দিয়ে সুর্য্যি মামা উকি মারে। রাতে মাঝে মাঝে চাঁদ মামার স্নিগ্ধ আলো এসে পড়ে গাছের চূড়ায়। এ অবস্থাকে বলা হয় প্রাকৃতিক বৈচিত্র। রোদে ঝলসে যাওয়া গাছপালা সবুজ হয়ে ওঠে।

বর্ষার সুশীতল বর্ষণ প্রকৃতির সকল চাওয়া- পাওয়াকে তৃপ্ত করে। বর্ষার আগমনে শুকনো ফাটা ফাটা ফসলের খেত পরিপূর্ণ হয় পানিতে। খাল বিল সব তলিয়ে কানায কনায় পানিতে পরিপূর্ণ হয়ে ওঠে। নদীগুলোর দুই পাড় পানিতে ভসে যায়। অনেক সময় উপচে পড়ে বন্যাও দেখা দেয়। বন্যা হয় আমাদের ক্ষতির কারণ। শ্রাবণ মাস যখন আসে তখন আমাদের দেশের অধিকাংশ এলাকা পানিতে তলিয়ে যায়। গ্রামীণ জনপদ বর্ষার পানিতে টইটম্বুর হয়ে ওঠে, বাড়িগুলো সব বিচ্ছিন্ন দ্বীপে পরিণত হয়।

বৃষ্টিতে ভিজতে শিশু কিশোরদের মন ব্যাকুল হয়ে ওঠে। বৃষ্টি আমাদের প্রকৃতিকে যেমন ফলে ফসলে ভরিয়ে দেয় তেমনি আমাদের মন-মানসকেও স্পর্শ করে, এযেন বর্ষা ঋতুর এক অফুরন্তলীলা বৈচিত্র।

বাংলাদেশ কৃষি প্রধান দেশ। কৃষির উপর নির্ভর করে বেঁচে আছে এ দেশের আশি ভাগ মানুষ। বর্ষায় আমন ধানসহ অন্যান্য ধান ও বিভিন্ন ধরনের ফসলের করা হয় বৃষ্টির পানিতে পাট গাছগুলো বড় হয়ে ওঠে। বর্ষার পানি পেয়ে পাটের আবাদ ভালো হয়। এ ছাড়াও এ ঋতুতেই এসব অর্থকরী ফসল ফলাতে হয়। তাই বর্ষা আমাদেও জীবনে অতি প্রয়োজনীয় ও অত্যন্ত গুরুপ্তপূর্ণ ঋতু। বর্ষার আমনের খেত কৃষকের মুখে হাসি ফোটায়, নিয়ে আসে সুখ, শান্তি । বর্ষা যেমন আনন্দ বয়ে আনে তেমনি দুঃখ-কষ্টও বয়ে আনে। কোন কোন সময় বন্যায় বাড়ী ঘর, রাস্তা-ঘাট পানিতে ডুবে যায়,নদী পারের মানুষেরা নদী ভাঙ্গনের শিকার হন, কৃষক ফসল হারায়, শাকশব্জী নষ্ট হয়ে যায়, নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম বেড়ে যায়।  ভুক্তভোগী  মানুষের  দুঃখ দুর্দশার সীমা থাকে না।  তাছাড়া বৃষ্টির পানিতে বেশিক্ষণ ভিজা ঠিক নয়, আর বন্যার পানি থেকে নিজেকে যতদূর সম্ভব বাঁচিয়ে রাখতে হবে- নচেৎ ঠাণ্ডা জনিত রোগ সর্দি কাশি জ্বর নিমুনিয়া বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে বিশেষ করে শিশুদের বিষয় বেশি সতর্ক থাকে হবে, কারন ঠাণ্ডা জনিত রোগে শিশুরা বেশি আক্রান্ত হয়ে থাকে।

আষাঢ়-শ্রাবণ দু’মাস বর্ষাকাল হলেও বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে এর পরেও বর্ষার প্রভাব থাকে। থাকে বৃষ্টিপাত। ফলে বর্ষা আর শরত্ যেন একাকার হয়ে যায়। হেমন্ত-কার্তিক মাসে পানি সরে যাওয়ার পর ক্ষেত পাথার যখন আবার জেগে ওঠে তখনই আসলে বর্ষার প্রভাব শেষ হয় প্রকৃতি থেকে।

বর্ষা প্রকৃতিকে ধুয়ে মুছে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করে দিয়ে যায়। জমিতে পলি জমে জমি উর্বর হয়, ফসলী জমিতে পোকা মাকরের আবাস, জমিতে জমে থাকা কীটনাশক ওষুধ সব ধুয়ে মুছে পরিস্কার করে দেয় বর্ষা, কৃষকের জন্য হয়ে উঠে আগামী দিনের স্বপ্ন। আমাদের মনের পঙ্কিলতা, হিংসা,বিদ্ধেষ, যত ক্ষোভ জমা আছে এই বর্ষাও যেন সব ধুয়ে মুছে পরিস্কার করে দেয়, পবিত্র মন নিয়ে যেন আমরা নতুন ভাবে আমাদের জীবন শুরু করতে পারি, বর্ষার কাছে সেই আর্শিবাদ কামনা করছি। কামাল উদ্দিন আহাম্মেদ, সম্পাদক, চেতনায় একাত্তর

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

Leave A Reply

Your email address will not be published.

%d bloggers like this: